মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলার ঐতিহ্য

সবার প্রিয় শীতল পাটি শিল্প:আনুমানিক আড়াই থেকে তিনশত বৎসর যাবৎ বংশ পরস্পরায় এটি চলে আসছে। এক সময় ঝালকাঠি শহর এবং ঝালকাঠি জেলাধীন রাজাপুর উপজেলার বিশেষ কয়েকটি এলাকায় এ শিপ্পের প্রসার। শুধু ঝালকাঠিতেই এর সুনাম ছিল না। জীবনানন্দের ঐতিহ্যবাহী রুপসী বাংলায় জন্ম অনেক জ্ঞানী-গুনীর। তাদের স্বপ্নের ঘর সাজানোর প্রধান আসবাব শীতলপাটি। দিনের ক্লান্তি মুছে দেয় একটি সুন্দর পরিপাটি শয়নকক্ষ, আরামদায়ক শষা এনে দেয় সুখ নিন্দ্রা।

 

তাঁত শিল্প :আনুমানিক দেড় থেকে দুইশত বৎসর ধরে ঝালকাঠি জেলা এবং এ জেলাধীন রাজাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ শিল্পের সুনাম ছিল। গোটা দেশেই ঝালকাঠি জেলার তাঁত শিল্প বিশেষ করে গামছার সুনাম ছিল। সুতা হল এ শিল্পের প্রধান উপকরণ। তাই সুতার মূল্য বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এ শিপ্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলো মূলধনের অভাবে তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সে চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। একসময় ঝালকাঠি শহরের নিকটবর্তী প্রবাহিত বাসন্ডা নদীর পশ্চিম দিকের গ্রামগুলোতে পুরো এলাকা জুড়ে প্রায় ৩৫০/৪০০ তাঁতি পরিবার ছিল। বর্তমানে সামান্য কয়েক ঘর ছাড়া প্রায় সবাই অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় একই সমস্যা রাজাপুরের আলগী, কৈবর্ত্তখালীসহ আঙ্গারিয়ার তাঁতি পরিবারগুলোর। মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছর পূর্বেও এ সব পরিবারের মহিলারা বেলভেটের শাড়ী, হাজার বুটি শাড়ী, ঝাপাশাড়ী এসব শাড়ী ছাড়াও গামছা, লুঙ্গী,মশারী এমনকি চাদরও তৈরি করত।

পান বরজঃজানা যায় রাজাপুর উপজেলার এসব অঞ্চলে পানের চাষ দীর্ঘ দিনের। আনুমানিক এক থেকে দেড় শ বছরের পুরোনো এতিহ্য মিশে আছে এ পান চাষের সাথে। পান মানে তাম্বুল। যার কথা লেখা আছে মধ্যযুগগের একমাত্র সাহিত্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাম কাব্যে। এ কাব্যের তাম্বুল খন্ডে তাম্বুলের (পান) কথা বিধৃত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ রাধার রুপে মুগ্ধ হয়ে বড়াইয়ের মাধ্যমে রাধার কাছে পান পাঠিয়ে দেয়। এ থেকে প্রমান হয় যুগে যুগে পান নারী পুরুষের ভালবাসার সেতু বন্ধন হয়ে আছে। আজও গ্রাম বাংলায় অতিথি আপ্যায়নের একমাত্র সামগ্রী এক চিলতে পান। শুধু তাই নয় বাংলার ঘরে ঘরে উৎসব আনন্দে পানের ডালা সাজানোর প্রতিযোগিতা চলে। একটি পানের খিলকি দিয়ে প্রকাশ করা হয় ভালবাসার অনুভূতি।

 

গ্রাম বাংলার মৃৎ শিল্পঃআমরা জানি স্বল্প মূলধন এবং স্বল্প পরিসরের শিল্প হল কুটির শিল্প যা কুটিরে বসে প্রস্তুত করা যায়। এ কুটির শিল্পের সাথে গ্রাম বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক সমস্য জড়িত। এক সময় ঝালকাঠি জেলার মৃৎ শিল্পের খ্যাতি ছিল কিন্তু আজকাল এ্যালুমিনিয়াম, চীনা মাটি, মেলামাইনএবং বিশেষ করে সিলভারে রান্নার হাড়ি কড়াই প্রচুর উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে মৃৎশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে । কথিত আছে এ মৃৎ শিল্প প্রায় দুই থেকে আড়াই শত বৎসর পূর্ব থেকে চলে। জানা যায় অতীতে এমন দিন ছিল যখন গ্রামের মানুষ এই মাটির হাড়ি কড়া, সরা,বাসন মালসা ইত্যাদি দৈনন্দিন ব্যবহারের সমসত উপকরণ মাটির বাবহার করতঃ কিন্তু আজ বদলে যাওয়া পৃথিবীতে প্রায় সবই নতুন রুপ। নতুন সাজে আবার নতুন ভাবে মানুষের কাছে ফিরে এসেছে। আজ শুধু গ্রাম বাংলার নয় শহরের শিক্ষিত সমাজ ও মাটির জিনিস বাবহার করে। তবে তা বিচিত্ররুপে। এখন মানুষের রুচি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিত্য নতুন রুপ দিয়ে মৃৎ শিল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করছে। এসব সামগ্রী গুলো মাটির ব্যাংক,রঙ্গীন ঘোড়া, নানা রঙ্গের পুতুল, নানা ধরণের পাখী, সুন্দর ফুলের টবসহ ফুলগাছ ফুলদানী, নৌকা ইতাদি।

 

 

পীর ও মাওলানাদের প্রভাব:ঝালকাঠির গ্রামাঞ্চলে পীর এবং মাওলানাদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি।সমগ্র  জেলার অধিকাংশ গ্রামের লোকেরা কোনোনা কোনো পীরের ভক্ত।কোনো মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্য অনেকেই পীরের দরবারে মানত করে থাকে।

 

মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান: এ জেলার মুসলমানরা সাধারণভাবে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। তারাসকল প্রকারধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শ্রদ্ধার সঙ্গেপালন করে।পবিত্র রমজান মাসে অনেকেই একমাস রোজা রাখে।আবার অবস্থাপন্ন লোকদের মধ্যে অনেকেইপ বিত্রহজও পালনকরে।

গ্রামাঞ্চলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই ছোটবড় মসজিদ আছে।মসজিদগুলোয় প্রতি শুক্রবারে গ্রামের লোকজন একত্রে সমবেত হয়ে জুমার নামাজ আদায় করে।

ধর্মীয় উৎসব: মুসলমানরা বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে ঈদুলআজহা, ঈদুল ফিতর ও ঈদেমিলাদুন্নবী এই তিনটি ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাবেন।শহর ও গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট মর্যাদার সঙ্গে এদিন তিনটি পালন করা হয়।

 

হিন্দু: সংখ্যার দিক দিয়ে মুসলমানদের পরেই এ জেলায় নমঃশূদ্র ও বর্ণহিন্দুদের স্থান। অতীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্ণহিন্দুদের সংখ্যাই ছিল বেশি। এদের জীবিকা ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে জনসংখ্যা পরিসংখ্যানে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ শ্রেণীর লোকেরা বর্ণহিন্দু। এদের মধ্যে একমাত্র কায়স্থরাই কৃষিকর্মে নিয়োজিত ছিল। নিম্নবর্ণের মধ্যে নমঃশূদ্রের প্রাধান্যই ছিল বেশি।

 

খাদ্য: ভাত, মাছ, ডাল আর শাকসবজিই হচ্ছে এ জেলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান খাদ্য। হাঁস ও মুরগি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বিভিন্ন পার্বণে বা অতিথি আপ্যায়নে গ্রামের সাধারণ মানুষ গরু-হাঁস-মুরগির মাংস পরিবেশন করে থাকে। দুধ যদিও সকলের খুব প্রিয় তবু গরীব লোকেরা তা খুব কমই খেয়ে থাকে। গরীব লোকদের সাধারণ খাবার হচ্ছে মাছ-ভাত। গ্রামে যাদের মাছ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা খাল-বিল থেকে মাছ ধরে খায়।

 

খেলা-ধূলা: এ জেলায়, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে, কাবাডি, ভলিবল ও হা-ডু-ডু এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলে ভলিবল ও ফুটবল খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইদানিং ক্রিকেট খেলাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নদীতে অনেক সময় নৌকা-বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে প্রতিযোগিতার নৌকাগুলো মনোরম সাজে সজ্জিত করা হয়।

 

সংগীত এবং নৃত্য: ভাটিয়ালি, রাখালি, মুর্শিদি, জারি এবং সারি গান এ অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। যাত্রা, কবি-গান, নাটক এবং পুঁথি পাঠেরও প্রচলন দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের লোকসঙ্গীতেরও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা আছে।

 

স্থাপত্য: বরিশাল জেলায় কিছু সংখ্যক প্রাচীন মসজিদ, মঠ ইত্যাদি স্থাপত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়। এ জেলার অনেক মসজিদের গঠন ও কারুকার্যের মধ্যে খানজাহান আলীর মসজিদের স্থাপত্যরীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার: বাখরগঞ্জ, মে. জে. (অব.) এম এ লতিফ সম্পাদিত, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ১৯৮৪।